প্রাচ্যের নগরিখ্যাত রাজধানী ‘ঢাকা’ এখন চারদিকে শুধু দুর্ভোগ আর দুর্ভোগ। অফিস-আদালত কিংবা নিজ নিজ কর্মস্থলে যেতে ঘন্টার পর ঘন্টা বেহাত সময় চলে যায়। শুধু অফিস-আদালতই নয়, রাজধানীর ধানমণ্ডি-গুলশান, বনানী ও বেইলি রোড, মগবাজারসহ সর্বত্রই নামি-ধামি স্কুল-কলেজ ও সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে প্রতিদিন ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হয়। সড়কগুলোতে যানজটের অন্যতম কারণ ঢাকা শহরে ব্যক্তিগত গাড়ির ক্রম-আধিক্য। এসব গাড়ির বড় একটি অংশ স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের আনা-নেয়ার কাজে ব্যবহার হয়। স্কুল-কলেজের সামনে ছুটির আগে থেকেই লম্বা লাইনে এক, দুই ক্ষেত্রবিশেষ তিন লেনে পার্ক করে রাখা হয় ব্যক্তিগত গাড়ি। আর যাদের গাড়ি নেই তাদের বহন করা রিকশার ভিড়ও কম নয়। ফলে যেসব সড়কের পাশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে সে সড়কগুলোতে চলাচল করা যাত্রীদের একটা বড় সময় ভোগান্তি পোহাতে হয় তীব্র যানজটে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ভিকারুননিসা নূন স্কুল এ্যান্ড কলেজ। রাজধানীর নামীদামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অন্যতম এটি একটি। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ধানমণ্ডি, বসুন্ধরা, আজিমপুরসহ চারটি ক্যাম্পাসের একটিতেও গাড়ি পার্কিংয়ের কোন ব্যবস্থা নেই। অথচ প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থী এসব ক্যাম্পাসে পড়াশোনা করছে। শিক্ষার্থীদের আনা-নেয়ার জন্য কমপক্ষে ১৫ হাজার প্রাইভেটকার প্রতিদিন যাতায়াত করে। একই চিত্র মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের মুগদা ও বনশ্রীর দু’টি শাখা রয়েছে। একটির জন্যও গাড়ি রাখার ব্যবস্থা নেই। সবচেয়ে বেশি সমস্যা তৈরি হয় মতিঝিল ক্যাম্পাসের আশপাশের রাস্তায়। সড়কের প্রায় অর্ধেক দখল করে গাড়ি রাখা হয় নিয়মিত। অথচ বলার কেউ নেই। প্রতিদিন স্কুল শুরু ও ছুটি হওয়া মানেই এই এলাকায় যানজটের আতঙ্ক। অন্তত চারঘণ্টা ভোগান্তি হয় যানজটের। আইডিয়ালের পাশে মতিঝিল মডেল, সরকারী আরও দু’টি স্কুলের জন্য প্রাইভেটকারে সড়ক দখলের ভোগান্তি নিয়মিত। সরকারি হিসেবে প্রতিদিন রাজধানীর ধানমণ্ডি এলাকায় ২১ হাজার গাড়ি যাতায়াত করে শিক্ষার্থীদের আনা-নেয়ার কাজে। শুধু রাজধানীর ব্যস্ততম নগরিই নয়, এর বাইরে দেশের খ্যাতনামা আরেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শামসুল হক খান স্কুল এণ্ড কলেজ। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৮ হাজার শিক্ষার্থী লেখা-পড়া করে। প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির আশপাশের এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়। তারমধ্যে রয়েছে-মুরগীরর্ফাম, ডগাইরবাজার, কদতলা ও কোনোপাড়াসহ আশপাশের এলাকা। তবে অভিভাবকরা বলছেন, এই যানজটের মূল কারণ অটোরিকসা। প্রতিদিন শিক্ষাপ্রতিষ্টানটির প্রবেশপথগুলোতে যাত্রী উঠা-নামার কারণে ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হয়। তার উপর অটো চালকদের বেপরোয়াভাবে চলাচলের কারণে অহরহ ঘটছে দুর্ঘটনা। তবে প্রশাসন এসব বিষয়ে একেবারেই নীরব। রাজধানীর মতিঝিলে অবস্থিত মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ছুটির সময় প্রতিদিন আশপাশের দীর্ঘ এলাকা জুড়ে তীব্র যানজট তৈরি হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির প্রভাতী শিফটের ছুটি সকাল সাড়ে ৯টার পরে হলেও সন্তানদের নিতে ৯টা থেকেই শুরু হয় অভিভাবকদের ব্যক্তিগত গাড়ি পার্কিং। দুই-তিন লেন ব্লক করে রাখে গাড়িগুলো। যখন স্কুল ছুটি হয় তখন পুরো রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে শিক্ষার্থীদের গাড়িতে তোলা হয়। এ সময় ওই এলাকায় ব্যাপক যানজট সৃষ্টি হয়। এ যানজট ছড়িয়ে পড়ে মতিঝিল ও কমলাপুর এলাকার প্রধান সড়কেও। এ দুই গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় যানজট অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলে বলে মনে করেন মতিঝিলের একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত মো. শাহ আলম। তিনি বলেন, মতিঝিল ও কমলাপুর একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। সকাল থেকে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে ব্যক্তিগত গাড়ি পার্ক করে রাখেন অভিভাবকরা। ফলে আশপাশের পুরো এলাকায় যানজট তৈরি হয়, সঙ্গে নষ্ট হয় আমাদের সময়, যা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে দেশের অর্থনীতিতে। ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোডের রাস্তায়ও একই চিত্র দেখা যায় নিয়মিত। এখানকার উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা প্রায় সবাই ব্যক্তিগত গাড়িতে স্কুল-কলেজে যায়। তাই তাদের যাওয়া-আসার সময় এ এলাকার সড়কগুলোতে যানজট তীব্র আকার ধারণ করে। ধানমন্ডি এলাকার যানজটের রেশ শহরের অন্যতম ব্যস্ত সড়ক মিরপুর রোডেও ছড়িয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে রাস্তায় স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত গাড়িগুলো যদি না থাকত, তা হলে যাত্রীরা কিছুটা হলেও স্বস্তির নিশ্বাস নিতে পারত বলে মনে করেন এ এলাকায় যাতায়াতকারী বিভিন্ন পরিবহনের যাত্রীরা। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে অবস্থিত সেন্ট জোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল, মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মোহাম্মদপুর গভর্নমেন্ট স্কুল ও রেসিডেনশিয়াল মডেল কলেজে রয়েছে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী। তবে আসাদগেট মোড় থেকে মোহাম্মদপুর পর্যন্ত যতদূর চোখ যাবে সড়কের দু’পাশে মনে হবে প্রাইভেটকারের মার্কেট। কোথাও এক সারি, কোথায় দুই সারিতে রাখা হয় এসব গাড়ি। আসাদ গেট থেকে মোহাম্মদপুর মোড় যেতে ছয়টি স্কুল-কলেজ রয়েছে। এর কোনটিরই নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থা নেই। তবে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, আসাদগেট থেকে মোহাম্মদপুর কাঁচা বাজারের সামনে পর্যন্ত রাস্তার উভয় পাশে শত-শত গাড়ি পার্ক করে রাখা হয়। রাস্তার দুই পাশে গাড়ি পার্ক করে রাখায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। গাড়ির চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোন স্কুলেরই নির্দিষ্ট পার্কিং প্লেস নেই। যে কারণে রাস্তাতেই পার্ক করতে হয়।
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থায়ীভাবে অপরিকল্পিত স্কুল-কলেজ স্থাপনসহ অবৈধভাবে গাড়ির পার্কিংয়ের সুযোগ দিয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) যে সমস্যা সৃষ্টি করেছে তার সমাধান নেই। তবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের ভাষ্য, তারা স্কুল-কলেজের সামনে গাড়ি পার্ক করে রাখার বিষয়টি দ্রুত সমাধান করবে। তবে ট্রাফিক পুলিশের ভাষ্য, এ স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীরা ব্যক্তিগত গাড়িতে যাতায়াতের কারণে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া বীর উত্তম জিয়াউর রহমান সড়কের পাশেই রয়েছে বিএএফ শাহীন স্কুল। এ স্কুলের শিক্ষার্থীদের গাড়ি পার্ক করার সুবিধা না থাকায় তাদের বেশিরভাগ গাড়িই রাস্তায় পার্ক করে রাখা হয়। অন্যদিকে ফার্মগেটে হলি ক্রস গার্লস হাই স্কুল ও সরকারি বিজ্ঞান কলেজের সামনে রাস্তায় গাড়ি রাখার কারণেও যানজটের সৃষ্টি হয়। আর বেইলি রোডে অবস্থিত ভিকারুননিসা ও সিদ্ধেশ্বরী স্কুলের শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের গাড়ির জন্যও আশপাশের এলাকায় তীব্র যানজট দেখা যায়। নামীদামী স্কুলের পাশাপাশি এখন কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষার্থীদের একটি অংশ প্রাইভেটকারে যাতায়াত করে। ফলে অলি গলিতে গজিয়ে ওঠা এমন স্কুলগুলোর কারণে দিন দিন যানজটের দুর্ভোগ বাড়ছে। বাসাবো লিটিল এঞ্জেলস স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাইভেটকার চালক আশিকুর রহমান জানান, স্কুল শুরু ও শেষ হলে গাড়ি নিয়ে আসতে হয়। সরু গলির কারণে যানজটে যত ভোগান্তি এর পুরোটাই আমাকেও পোহাতে হয়। তাছাড়া পুলিশ ও সাধারণ পথচারীদের উপদ্রব তো আছেই। কাকরাইল উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের সামনে স্কুল শুরু ও ছুটির সময় রীতিমতো প্রাইভেটকারের মেলা বসে। অন্তত ১০ জন চালক জানিয়েছেন, এখন স্কুলের সামনে ছুটি পর্যন্ত গাড়ি নিয়ে অপেক্ষার সুযোগ নেই। ব্যস্ততম সড়ক হওয়ায় যাত্রী নামিয়ে বাসায় ফিরতে হয়। অথবা নিরিবিলি আশপাশের কোন সড়কে পার্কিং করলেও পুলিশ ধরে। গুলশান-১ ও ২ নম্বরের বিভিন্ন সড়কে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোন কমতি নেই। সেখানেও রাস্তায় পার্কিং করে প্রাইভেটকার রাখার দৃশ্য চোখে পড়ে। যে কারণে এসব এলাকাতেও যানজট হচ্ছে। রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় হলিক্রস স্কুলের সামনে গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে অন্তত দুই কিলোমিটার সড়ক অচল হয়ে যায়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর যানজটের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের কারণ স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার। ঢাকায় মোট ট্রিপের ১৭-১৮ শতাংশই স্কুল কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত সংক্রান্ত। সাম্প্রতিক বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস উপলক্ষে রাজধানীতে ঢাকা পরিবহন কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) আলোচনা সভায় জানানো হয়, প্রাইভেটকারের কারণে বাড়ছে রাজধানীর যানজট। ঢাকায় যানজটে দিনে ৮২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। কমে যায় শ্রমের মান। যানজট নিরসনে ২০০৯ সালে সরকারের পক্ষ থেকে স্কুলগামী যানবাহনের পরিমাণ কমাতে একটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। তারই অংশ হিসেবে যাত্রা শুরু হয়েছিল স্কুলবাসের। এ নিয়ে ওই বছরের নভেম্বর মাসে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শহরের বিভিন্ন স্কুল-কলেজ কর্তৃপক্ষ একটি বৈঠক করে। এতে উভয় পক্ষ শিক্ষার্থীদের জন্য বাস পরিষেবা চালু করতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু এটি পরে আর তেমনভাবে কার্যকর হয়নি। এ ছাড়া সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলাম স্কুলবাসের উদ্যোগ নিলে সেটিও কার্যকর হয়নি।
এদিকে, অপরিকল্পিত স্কুল-কলেজ স্থাপনে অনুমোদন দেয়া এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় স্থায়ীভাবে এ সমস্যা তৈরির জন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (রাজউক) দোষারোপ করছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল হক। তিনি বলেন, স্থায়ী সমস্যার কোনো সমাধান হয় না। রাজধানীর স্কুল-কলেজগুলো করা হয়েছে প্রধান সড়কের পাশে। রাজউকই এগুলোর অনুমোদন দিয়েছে। রাজউকের কর্মকর্তারা জানতেন এ স্কুল-কলেজগুলো যানজট তৈরি করবে। তার পরেও তারা অনুমোদন দিয়েছেন। তাদের কোনো পরিকল্পনা নেই। রাজউকের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, নিয়ম হচ্ছে, যেখানেই ২৫ হাজার মানুষের বাস, সেখানেই একটা স্কুল-কলেজ লাগবে। কমিউনিটির ভেতরে স্কুল-কলেজ হলে শিক্ষার্থীরা হেঁটে হেঁটে চলে যাবে। তখন ব্যক্তিগত গাড়ির প্রয়োজন পড়বে না এবং স্কুলবাসও প্রবর্তন করা যায়। এ নিয়মেই সারা পৃথিবী চলছে। কিন্তু আমাদের রাজউকের ধ্যান-জ্ঞান কিছুই নেই। প্ল্যান পাস করে রাজউক তাদের আখের গুছিয়েছে। বিনিময়ে শহরের জন্য স্থায়ী একটা সমস্যা তৈরি করেছে। এটির এখন সমাধান দেয়া সম্ভব নয়। মানুষকে তো আসতে বাধা দেয়া যাবে না। গাড়ি তো পরের কথা, ভ্যানগাড়ি রাখার জায়গাও নেই।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

রাজধানীর স্কুল-কলেজের সামনে অপরিকল্পিত পার্কিং, ভোগান্তিতে ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকরা
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গুরুতর সংকটের নেই সমাধান
- আপলোড সময় : ২৮-১১-২০২৪ ১২:১৫:৫০ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৮-১১-২০২৪ ১২:১৫:৫০ পূর্বাহ্ন


কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ